Smart City Agartala : আগরতলার অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্য কেন্দ্র বটতলা। সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে এবং শহরের রূপ পরিবর্তনের লক্ষ্যে কোটি কোটি টাকা সরকারি অর্থ ব্যয় করে ‘স্মার্ট সিটি’ প্রকল্পের আওতায় সাজিয়ে তোলা হয়েছিল এখানকার পার্কটি। লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ ও সুন্দর—ব্যস্ততম এই এলাকায় সাধারণ নাগরিকেদের একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার মতো একটি সুরক্ষিত ও মনোরম পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু বর্তমানে বটতলা পার্কের যে বীভৎস বাস্তব রূপ সামনে এসেছে, তা এক কথায় চরম প্রশাসনিক ব্যর্থতার জলজ্যান্ত দলিল। আজ আর এই পার্কটি কোনো নাগরিকের স্বস্তির ঠিকানা নয়, বরং সৌন্দর্যায়নের নামে সরকারি তহবিলের বিপুল অপচয় এবং চরম অব্যবস্থাপনার এক বিদ্রূপাত্মক প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
পার্কের সার্বিক পরিবেশ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থা এখানে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। পার্কে প্রবেশের মুখেই দেখা মেলে পুঞ্জীভূত আবর্জনা আর বটতলা মাছ বাজারের বর্জ্যের স্তূপ। পচা মাছের অবশিষ্টাংশ, মাছের পেটি ও অন্যান্য বিষাক্ত বর্জ্য পার্কের দেওয়াল ঘেঁষে ফেলা হচ্ছে হরহামেশাই। তা থেকে নির্গত তীব্র বিষাক্ত দুর্গন্ধ পুরো এলাকার বাতাসকে ভারী করে তুলেছে। দুর্গন্ধের চোটে পথচলতি মানুষের শ্বাস নেওয়াও কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর ও লজ্জাজনক বিষয় হলো, আগরতলা পুর নিগমের আবর্জনা সংগ্রহের গাড়ি খোদ পার্কের সামনে ও রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও তার ঠিক পাশেই উন্মুক্তভাবে ফেলা হচ্ছে এই বর্জ্য। সরকারি নজরদারি ও কঠোর পদক্ষেপের অভাবে পরিচ্ছন্নতার ন্যূনতম নিয়মাবলিও এখানে শিকেয় উঠেছে। পুর নিগমের এই চরম উদাসীনতা প্রমাণ করে যে, কোটি টাকা খরচ করে পার্ক তৈরি হলেও তা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে দায়িত্বশীলতা দরকার, প্রশাসনের কাছে তার তীব্র অভাব রয়েছে।
পরিস্থিতি আরও ভয়ঙ্কর রূপ নেয় সূর্য ডোবার পর। পার্কের ভেতরের দৃশ্য এখন আরও আশঙ্কাজনক। সন্ধ্যার ছায়া নামতেই আলো ঝলমলে এই স্মার্ট পার্ক রূপান্তরিত হয় অসামাজিক কাজের স্বর্গরাজ্যে। অভিযোগ, প্রতিনিয়ত পার্কের ভেতর বসছে নেশার আসর। বিভিন্ন কোণে অনায়াসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায় মদের খালি বোতল, ব্যবহৃত প্লাস্টিক এবং নানা ক্ষতিকর নেশাজাতীয় পণ্যের অবশিষ্টাংশ। দিনের আলোতেও পার্কের ভেতর এসব নোংরা আবর্জনা থিকথিক করছে। আইনশৃঙ্খলার এই করুণ অবস্থার কারণে সাধারণ পরিবার, শিশু ও প্রবীণ নাগরিকরা পার্কে পা রাখতে ভয় পাচ্ছেন। যে পার্ক তৈরি হয়েছিল সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য, আজ অসামাজিক মৌল ও নেশাসক্তদের অবাধ বিচরণক্ষেত্রে পরিণত হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই নাগরিক নিরাপত্তাহীনতার চরম আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এই চরম অব্যবস্থার সামনে দাঁড়িয়ে বেশ কিছু গুরুতর প্রশ্ন উঠে আসছে স্মার্ট সিটি কর্তৃপক্ষ, আগরতলা পুর নিগম এবং স্থানীয় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে একের পর এক পরিকাঠামো নির্মাণ করলেই কি দায়ভার শেষ হয়ে যায়? যদি উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণ, সার্বক্ষণিক নজরদারি, পরিচ্ছন্নতা এবং পর্যাপ্ত পুলিশি নিরাপত্তার ব্যবস্থা না থাকে, তবে এই ধরনের বিশাল প্রকল্পের প্রকৃত সুফল ভোগ করছে কারা? পার্কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেন নিয়মিত পুলিশি টহল বা পর্যাপ্ত গার্ডের ব্যবস্থা করা হচ্ছে না?
স্মার্ট সিটি মানে কেবল কিছু চোখধাঁধানো কনক্রিটের কাঠামো বা বাহ্যিক অলংকরণ নয়; স্মার্ট সিটির প্রকৃত অর্থ হলো নাগরিকদের উন্নত জীবনমান, সুশাসন, পরিচ্ছন্নতা এবং সর্বোচ্চ নিরাপত্তা প্রদান করা। বটতলার বর্তমান বাস্তব চিত্র প্রমাণ করে যে, প্রশাসনিক নজরদারির চরম অভাবে সরকারি অর্থের বিপুল অপচয় ঘটছে এবং নাগরিকদের স্বার্থ সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে। প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এখনই সময় হয়েছে ঘুম ভাঙার। অবিলম্বে অসামাজিক কার্যকলাপ বন্ধে কড়া পুলিশি পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে এনে বটতলা পার্ককে পুনরায় পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ নাগরিক চত্বরে রূপান্তর করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায়, ‘স্মার্ট সিটি’ শব্দটি কেবল কাগজে-কলমে আঁকা এক প্রহসনেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।






