Payment Scanner Scam : ডিজিটাল লেনদেনের সুবিধাকে পুঁজি করে অর্থ উপার্জনের অসাধু ধান্ধায় মেতে উঠেছে একশ্রেণীর অসাধু যুবক-যুবতী। আপাতদৃষ্টিতে ভদ্র ও মার্জিত পোশাকের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এমনই এক প্রতারকের হাতেনাতে ধরা পড়ার ঘটনা ঘিরে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে কৃষ্ণনগরের টিআরটিসি সংলগ্ন পেট্রোল পাম্প এলাকায়। দীর্ঘদিন ধরে ফোনপের নাম করে অনলাইনে ভুয়া ট্রানজেকশন দেখিয়ে লিটার লিটার পেট্রোল হাতিয়ে নিচ্ছিল এক যুবক, অথচ পেট্রোল পাম্পের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা পড়ছিল না একটি ফুটো পয়সাও! অবশেষে লাগাতার নজরদারি ও সচেতনতার জেরে শনিবার পুনরায় একই কায়দায় প্রতারণা করতে এসে পাম্প কর্মী ও স্থানীয়দের হাতে ধরা পড়ে যায় সেই চতুর প্রতারক।
ধৃত যুবকের নাম দীপঙ্কর দাস, বাড়ি ভুকলী মধুবন এলাকায়। পাম্পের ম্যানেজার অনুপ বাবু ও অন্যান্য কর্মীদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই যুবক প্রতিদিন নিয়ম করে পাম্পে এসে নিজের বাইকে বিপুল পরিমাণ পেট্রোল ভরিয়ে নিত। তারপর পেমেন্টের সময় কিউআর কোড স্ক্যান করে মোবাইল স্ক্রিনে সফল পেমেন্টের মেসেজ ও চালান পাম্প কর্মীদের দেখাত। কর্মীরাও মোবাইলের স্ক্রিনে ফোনপের মতো দেখতে ইন্টারফেস দেখে বিশ্বাস করে তাকে যেতে দিতেন। কিন্তু দিনের শেষে পাম্পের অ্যাকাউন্টের হিসাব মিলাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত বড় অঙ্কের আর্থিক ঘাটতি ধরা পড়ছিল। পাম্পের সাধারণ কর্মচারীরা, যারা মাসে মাত্র ৮০০০ থেকে ৮৫০ টাকা বেতনে রাতদিন পরিশ্রম করেন, তাদের হিসাবের ঘাটতির জন্য প্রতি মাসে প্রায় ৫০০০ থেকে ৬০০০ টাকা পর্যন্ত নিজের পকেট থেকে মেটাতে হচ্ছিল। এমন একাধিক কর্মীর সম্মিলিত ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল হাজার হাজার টাকায়।
সন্দেহ দানা বাঁধায় পাম্প কর্তৃপক্ষ ও কর্মচারীরা সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা শুরু করেন এবং জানতে পারেন যে নির্দিষ্ট একটি ছেলেই বারবার এসে এভাবে অনলাইন পেমেন্টের ভাওতা দিচ্ছে এবং এক টাকাও সে পেমেন্ট করছে না। এরপরের টানা দু-তিন দিন ধরে তার ওপর কড়া নজর রাখা হয়। শুক্রবার সকালেও সে একইভাবে এক মহিলা কর্মচারীর কাছ থেকে ১৩০০ টাকার পেট্রোল নেয় এবং বিকেলে আবার এসে ১০৫০ টাকার তেল নিয়ে চলে যায়। পাম্প কর্মী ও ম্যানেজার বুঝতে পারেন, এটি কোনো সাধারণ নেটওয়ার্কের ভুল নয়, বরং একটি পরিকল্পিত স্ক্যাম। সে কারণে শনিবার তাকে পাকড়াও করার জন্য বিশেষ পরিকল্পনা করে রাখা হয়। প্রত্যাশামতো শনিবারও সে তেল নিতে এলে কর্মীরা তার পেমেন্ট প্রক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণ করেন এবং পেমেন্ট সম্পন্ন হওয়ার দাবি করতেই তাকে ঘিরে ফেলে জেরা করা শুরু হয়।
তদন্তে ও জেরায় বেরিয়ে আসে এই প্রতারণার আসল ভয়াবহ কৌশল। অভিযুক্ত যুবক কোনো প্রকৃত ইউপিআই অ্যাপ বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে লেনদেন করত না। সে তার মোবাইলে ফোনপে অ্যাপের ইন্টারফেসের মতো দেখতে একটি ভুয়া ওয়েবসাইট বা ফেক পেমেন্ট অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করত। এই ভুয়া অ্যাপে স্ক্যানার সুবিধা থাকলেও কোনো প্রকৃত ইউপিআই আইডি যুক্ত ছিল না। স্ক্যান করার ভঙ্গি করলেই স্ক্রিনে সরাসরি এক স্থির পেমেন্ট রিসিট ও ব্যাঙ্কের ভুয়া ব্যালেন্স (যেমন ১২,৯০০ টাকা) ফুটে উঠত। লেনদেন সম্পন্ন হোক বা না হোক, প্রতিবারই সেই নির্দিষ্ট অংকটিই অবিকল ভেসে থাকত। পাম্প কর্মীরা অবিলম্বে তাকে ব্যাংকে নিয়ে যান ট্রানজেকশন আইডি ও স্টেটমেন্ট যাচাই করার জন্য, কিন্তু ব্যাংক কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে এমন কোনো লেনদেনের অস্তিত্বই তাদের সিস্টেমে নেই। জালিয়াতির প্রমাণ হাতেনাতে মিলতেই পাম্পের কর্মচারীরা তাকে আটকে রাখেন এবং বকেয়া সমস্ত টাকা আদায়ের দাবি জানান। বর্তমান যুগে ডিজিটাল পেমেন্টের এই বিপজ্জনক ও সুচতুর প্রতারণা ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের সুরক্ষাকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।






