খবরে প্রতিবাদ

খবরে প্রতিবাদ

Tuesday, 11 August 2026 - 06:17 PM
মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬ - ০৬:১৭ অপরাহ্ণ

সরকারের জনবিরোধী নীতির প্রতিবাদে আগরতলা থেকে সাব্রুম বামেদের ‘জেল ভরো’ আন্দোলন

সরকারের জনবিরোধী নীতির প্রতিবাদে আগরতলা থেকে সাব্রুম বামেদের ‘জেল ভরো’ আন্দোলন
1 minute read

সরকারের জনবিরোধী নীতির প্রতিবাদে আগরতলা থেকে সাব্রুম বামেদের ‘জেল ভরো’ আন্দোলন : কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন নীতি কে জন বিরোধী আখ্যা দিয়ে এর প্রতিবাদ এবং শ্রমিক-কৃষক-মজদুর সহ সাধারণ মানুষের একাধিক দাবিকে সামনে রেখে সোমবার, ১০ আগস্ট, ত্রিপুরাজুড়ে ‘জেল ভরো’ ও আইন অমান্য আন্দোলনে নামল বামপন্থী দল ও গণসংগঠনগুলি। সিপিআই(এম)-এর চারটি গণসংগঠনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচি রাজ্যের ২১টি মহকুমায় সংগঠিত হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে। রাজধানী আগরতলা থেকে শুরু করে বিশালগড়, তেলিয়ামুড়া, খোয়াই ও সাব্রুম—বিভিন্ন এলাকায় মিছিল, পথসভা, ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা, পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি এবং বিক্ষোভকারীদের আটককে ঘিরে দিনভর রাজনৈতিক উত্তেজনা দেখা যায়।

শ্রমিক, কৃষক, ক্ষেতমজুর ও সাধারণ মানুষের স্বার্থে ১১ দফা দাবিকে সামনে রেখে এই আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। সিআইটিইউ, কৃষক সভা, উপজাতি গণমুক্তি পরিষদ এবং ত্রিপুরা ক্ষেতমজুর ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে কর্মসূচি পালিত হয়। বাম নেতৃত্বের অভিযোগ, সরকারের সার্বিক জনবিরোধী নীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। সেই পরিস্থিতির প্রতিবাদেই আইন অমান্য আন্দোলনের পথে নামা হয়েছে।

আগরতলায় পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে আইন অমান্য

রাজ্যের সবচেয়ে বড় কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয় রাজধানী আগরতলায়। ওরিয়েন্ট চৌমুহনী থেকে শুরু হয় বাম কর্মী-সমর্থকদের মিছিল। বিভিন্ন স্লোগান দিতে দিতে মিছিল এগিয়ে যায় আগরতলা পোস্ট অফিস চৌমুহনী এলাকার দিকে। সেখানে পুলিশের ব্যারিকেড ঘিরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেড অতিক্রম করে আইন অমান্য কর্মসূচি পালন করেন।
রাজধানীর এই কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার, বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরী, প্রাক্তন মন্ত্রী মানিক দে, কৃষক নেতা পবিত্র কর-সহ বাম বিধায়ক এবং দলের বিভিন্ন স্তরের নেতৃত্ব। পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক যুবক, মহিলা ও কর্মী-সমর্থক কর্মসূচিতে অংশ নেন।
বক্তব্য রাখতে গিয়ে বাম নেতৃত্ব কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করেন। শ্রমিক-কৃষক ও সাধারণ মানুষের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন আরও জোরদার করার বার্তাও দেওয়া হয়।

বিশালগড়ে তরুণ বাম কর্মীদের উপস্থিতি

রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাম রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বিশালগড়েও সোমবারের ‘জেল ভরো’ আন্দোলনে ব্যাপক সাড়া পড়ে। মহকুমা নেতৃত্বের উদ্যোগে আয়োজিত কর্মসূচিতে বিপুল সংখ্যক তরুণ-যুবক এবং মহিলা অংশগ্রহণ করেন।
লাল পতাকা হাতে এবং বিভিন্ন স্লোগান দিতে দিতে আন্দোলনে অংশ নেন কর্মী-সমর্থকরা। বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র স্লোগানও শোনা যায়। কর্মসূচি চলাকালীন পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ধস্তাধস্তির পরিস্থিতি তৈরি হয়। এরপর বেশ কয়েকজন বাম কর্মীকে আটক করা হয় বলে জানা গেছে।
দলীয় নেতৃত্বের দাবি, বিশালগড়ে এখনও বাম সংগঠনের সাংগঠনিক ভিত্তি যথেষ্ট শক্তিশালী। সোমবারের কর্মসূচিতে তরুণ প্রজন্মের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি সেই সাংগঠনিক শক্তিরই বহিঃপ্রকাশ বলে দাবি করেন তাঁরা।

তেলিয়ামুড়ায় পোস্ট অফিসের সামনে বিক্ষোভ

একই দিনে তেলিয়ামুড়াতেও সিপিআই(এম) তেলিয়ামুড়া বিভাগীয় কমিটির উদ্যোগে আইন অমান্য আন্দোলন হয়। তেলিয়ামুড়া পোস্ট অফিসের সামনে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে স্লোগান তুলে বিক্ষোভ দেখান দলের কর্মী-সমর্থকরা।
আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মী-সমর্থক অংশ নেন। বিক্ষোভ চলাকালীন প্রশাসনের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের আটক করা হয়। তেলিয়ামুড়া মহকুমা শাসকের ডিসিএম বিশ্বজিৎ মজুমদারের নির্দেশে আটক ব্যক্তিদের পরবর্তীতে ডিটেনশন ক্যাম্প হিসেবে নির্ধারিত চিত্রাঙ্গদা কলা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয় বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
এই কর্মসূচি থেকেও বাম নেতৃত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে সরব হন এবং সাধারণ মানুষের দাবিদাওয়া নিয়ে আগামী দিনে আরও বৃহত্তর আন্দোলনের ইঙ্গিত দেন।

খোয়াইয়ে মিছিল, ‘জেল ভরো’ কর্মসূচি

খোয়াইতেও বিভিন্ন দাবিকে সামনে রেখে সিপিআই(এম)-এর উদ্যোগে ‘জেল ভরো’ আন্দোলন সংগঠিত হয়। দলের কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে মিছিল শহরের বিভিন্ন পথ পরিক্রমা করে পুরনো টাউন হলের সামনে এসে শেষ হয়।
কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন খোয়াইয়ের সিপিআই(এম) বিধায়ক নির্মল বিশ্বাস, পলাশ ভৌমিক-সহ দলের অন্যান্য নেতা-কর্মীরা। মিছিল ও সমাবেশকে কেন্দ্র করে কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো।
আন্দোলনকে ঘিরে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সেজন্য এলাকায় ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সভা থেকে বাম নেতৃত্ব সরকারের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে সরব হন। পরবর্তীতে কর্মসূচি এবং দলের দাবিদাওয়া নিয়ে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বক্তব্য রাখেন বিধায়ক নির্মল বিশ্বাস।

সাব্রুমে ‘দেশ বাঁচাও–মানুষ বাঁচাও’ স্লোগান

দক্ষিণ ত্রিপুরার সাব্রুমেও সোমবার চারটি বামপন্থী গণসংগঠনের যৌথ উদ্যোগে ‘দেশ বাঁচাও–মানুষ বাঁচাও’ স্লোগানকে সামনে রেখে জেল ভরো আন্দোলন অনুষ্ঠিত হয়।
এই কর্মসূচিতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দাবি সামনে তুলে ধরা হয়। চার শ্রমকোড বাতিল, এমজিএনরেগায় বছরে ২০০ দিনের কাজ এবং দৈনিক ৬০০ টাকা মজুরি, শহরাঞ্চলে টুয়েপ প্রকল্প চালু এবং এডিসিকে আরও ক্ষমতা দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
এর পাশাপাশি বিদ্যুতের বর্ধিত মাশুল প্রত্যাহার, অনিয়মিত কর্মীদের নিয়মিতকরণ, নারী নির্যাতন বন্ধ এবং পেট্রোল-ডিজেল ও রান্নার গ্যাসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানোর দাবিও ওঠে।
কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন সিপিআই(এম) রাজ্য কমিটির নেতৃত্ব কৃষ্ণা রক্ষিত, গণমুক্তি পরিষদের নেতা প্রভাত চৌধুরী, সিপিআই(এম) মহকুমা সম্পাদক অরুণ ত্রিপুরা-সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
মিছিল তৃতীয় ব্যারিকেডের কাছে পৌঁছালে পুলিশ আন্দোলনকারীদের আটক করে। আয়োজকদের দাবি, সাব্রুমে এই কর্মসূচি থেকে মোট ৯৭২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এই সংখ্যাটি আন্দোলনকারীদের দেওয়া হিসাব হিসেবে সামনে এসেছে।

১১ দফা দাবিতে আন্দোলনের ডাক

বাম সংগঠনগুলির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই আন্দোলন শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়; শ্রমিক, কৃষক, ক্ষেতমজুর, যুবক, মহিলা এবং সাধারণ মানুষের একাধিক দাবিকে সামনে রেখেই দেশজুড়ে এই কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে।
কাজের সুযোগ বৃদ্ধি, শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা, কৃষকদের স্বার্থ, গ্রামীণ কর্মসংস্থান, মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুতের মাশুল, নারী নিরাপত্তা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানোর মতো বিষয়গুলি আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে।
ত্রিপুরার ২১টি মহকুমায় একই দিনে আন্দোলন সংগঠিত হওয়ায় রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বাম কর্মী-সমর্থকদের সক্রিয়তা চোখে পড়ে। কোথাও মিছিল ও সভা, কোথাও ব্যারিকেড অতিক্রম করে আইন অমান্য, আবার কোথাও পুলিশি আটক—সব মিলিয়ে সোমবার রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক কর্মসূচির দিক থেকে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।


বাম নেতৃত্বের দাবি, সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন থামবে না। অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, সেদিকেও প্রশাসনের নজর ছিল।
সব মিলিয়ে ১০ আগস্টের ‘জেল ভরো’ ও আইন অমান্য আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ত্রিপুরার রাজপথে ফের শক্তি প্রদর্শন করল বাম শিবির। আগরতলা থেকে সাব্রুম, বিশালগড় থেকে খোয়াই—বিভিন্ন মহকুমায় কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতি এবং আটককে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ আগামী দিনে আরও বাড়ে কি না, এখন সেটাই দেখার।

For All Latest Updates

খাস খবর