VC Election Tripura : উপর তলায় কোলাকুলি, নিচ তলায় রক্তপাত! মথা-বিজেপি জোটে নাটকের রাজনীতি, সিপিআইএমের সাথে মথার নতুন সমীকরণ ! রাজ্য রাজনীতিতে আজ যেন নাটকের নতুন অধ্যায় ! জোট শরিক তিপ্রা মথার হাতে নিজেদের কর্মীরাই আক্রান্ত, আর সেই ক্ষোভে দিল্লির কাছে মথার দুই মন্ত্রীকে ‘লাথি মেরে’ বের করার দাবি তুলছেন খোদ বিজেপিরই কর্মীরা! রাজপথে নেমে নিজেদের সরকারের বিরুদ্ধেই হুঙ্কার, আর দলীয় কার্যালয়ে পতাকা জমা দিয়ে রাজনীতি ছাড়ার কান্না—আজকের ত্রিপুরায় এটিই নিচুতলার করুণ বাস্তবতা। কিন্তু নাটকের এখানেই শেষ নয়!
একদিকে পাহাড়ে বিজেপির বুথ অফিস পুড়ছে, অন্যদিকে ধর্মনগরে ক্ষমতা দখলের লোভে বিজেপিকে বাইপাস করে রাতারাতি চিরশত্রু সিপিআইএম-এর সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিজয় মিছিল করছে তিপ্রা মথা! একেই কি বলে ‘উপরে দোস্তি, নিচে কুস্তি’? রাজনৈতিক মহলের তীব্র কটাক্ষ—সরকারে একসঙ্গে বসে থাকার এই লোক দেখানো নাটক আর কতদিন? বিস্তারিত জানাবো আমাদের আজকের বিশেষ প্রতিবেদনে।
তিপ্রা মথা-বিজেপি জোটের অন্দরে বিষাদ ও বিক্ষোভ: পাহাড়ে রক্তক্ষয়ী ‘দোস্তি-কুস্তি’, অপরদিকে বাম-মথা মাখামাখি।
রাজ্যের শাসনক্ষমতায় একই ছাদের তলায় থাকলেও পাহাড়ে ভারতীয় জনতা পার্টি এবং তিপ্রা মথার সম্পর্ক আজ এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে। ক্ষমতার শীর্ষমহলে নীতিগত জোট বা ‘দোস্তি’ থাকলেও রাজ্য রাজনীতির নিচুতলায় চরম ‘কুস্তি’, সন্ত্রাস ও চরম হতাশার চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভিলেজ কমিটি নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর থেকে গ্রামীণ উপজাতি এলাকাগুলিতে ঘটে চলা একাধিক হিংসাত্মক ঘটনা, দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর, এবং জোটের অন্দরে প্রকাশ্য বিদ্রোহ আজ শাসক শিবিরের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে।
একদিকে বিজেপির নিজস্ব কর্মী-সমর্থকেরা রাজপথে নেমে তিপ্রা মথার দুই মন্ত্রীকে মন্ত্রিসভা থেকে বের করে দেওয়ার দাবি তুলে সড়ক অবরোধ করছেন; অন্যদিকে, ক্ষমতা দখলের অংকে জোট ধর্মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বামপন্থী সিপিআইএমের সঙ্গে তিপ্রা মথার প্রত্যক্ষ সমঝোতার খবর প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সরকারের শীর্ষস্তরের সমঝোতা যে নিচুতলার কর্মীদের আবেগকে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করতে পারেনি, তার বাস্তব প্রমাণ মিলেছে রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও চরম বিক্ষোভে।
বুধবার সকাল থেকেই শান্তিরবাজার মহকুমার বীরচন্দ্র মনু–মনপাথর বাজার এলাকায় বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে প্রবল রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়ায়।
মঙ্গলবার রাস্তা অবরোধের সময় দুষ্কৃতীদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশকে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হলেও, সময়সীমা পার হওয়ার পরও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন শাসকদলের কর্মীরা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই আন্দোলনের নিশানায় ছিল না কোনো বিরোধী দল; বরং তাদের তীব্র আক্রমণ ছিল নিজেদেরই জোট শরিক তিপ্রা মথার বিরুদ্ধে। আন্দোলনকারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন—এ কেমন জোট শরিক ?
দিল্লির শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে অবিলম্বে বার্তা পৌঁছে দিয়ে তিপ্রা মথার দুই মন্ত্রীকে সরকার থেকে ছেঁটে ফেলার দাবি জানান ক্ষুব্ধ বিজেপি কর্মীরা। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য, যতক্ষণ না এই দুই মন্ত্রীকে মন্ত্রিসভা থেকে বের করা হচ্ছে, ততক্ষণ ত্রিপুরায় প্রকৃত শান্তি ফিরবে না এবং এডিসি-র কাজের গতিও আসবে না।
জনজাতিকে জনজাতির বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়ার অভিযোগ এনে দলের কর্মীরাই দাবি করেন, শাসকদলের অঙ্গ হয়েও নিচুতলায় প্রতিনিয়ত তাদের লাঞ্ছনা ও বঞ্চনার শিকার হতে হচ্ছে। শুনুন কি বলছেন তারা –
অবরোধ চলাকালীন মহকুমা পুলিশ আধিকারিক বাপি দেববর্মার ভূমিকা ও সামগ্রিক পুলিশ প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা নিয়েও সরব হন বিজেপি কর্মীরা। আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, ভোটের পর থেকে তাদের ওপর ক্রমাগত হামলা হলেও পুলিশ নির্বিকার ভূমিকা পালন করছে। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ কর্মীরা দাবি করেন, সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে এমন কিছু গোপন তথ্য তাদের হাতে রয়েছে, যা প্রকাশ্যে আনলে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের চাকরি পর্যন্ত থাকবে না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দীর্ঘ সময় পর স্থানীয় বিধায়ক ও মণ্ডল কমিটির নেতৃত্ব ঘটনাস্থলে পৌঁছে আশ্বাস দিলে অবরোধ তোলা হয় ঠিকই, তবে কর্মীদের মধ্যে যে গভীর হতাশা ও বক্ষবিদারক আক্ষেপ দেখা যায়, তা শাসকদলের ভাবমূর্তিকে বড় সড় প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
নিচুতলার বহু পুরোনো ও নিষ্ঠাবান কর্মী সাফ জানিয়ে দেন, দলের হয়ে দীর্ঘদিন রক্ত-ঘাম ঝরালেও তারা কোনো ন্যায়বিচার পাননি। আক্ষেপের সাথে তারা জানান, তারা দল ও তার পতাকাকে ভালোবাসেন বলেই সম্মান জানিয়ে বিজেপির দলীয় কার্যালয়ে পতাকা ফিরিয়ে দিয়ে রাজনীতি থেকে চিরতরে সরে দাঁড়াবেন।
একই ধরণের থমথমে ও অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে অমরপুর বিধানসভা কেন্দ্রেও। ভিলেজ কমিটি নির্বাচনে এনডিএ জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও ভোটের ফল প্রকাশের পরপরই উত্তর একছড়ি ভিলেজের বিজেপি বুদ্ধ মন্দির শক্তি কেন্দ্র কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিকাণ্ডের নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে। ওই ভিলেজের ৯টি আসনের মধ্যে ৭টিতে জয়ী হয় তিপ্রা মথা এবং বাকি ২টি পায় বিজেপি সমর্থিত নির্দল। ফলে বিরোধীদের অস্তিত্বহীন এক এলাকাতে বিজেপির কার্যালয় কে বা কারা ভাঙল, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হলেও স্থানীয়দের আঙুল তিপ্রা মথার দিকেই।
উপরন্তু, বিজয়ী নির্দল প্রার্থীকে জোরপূর্বক মথায় যোগদান করাতে গিয়ে জনরোষের মুখে পড়েন মথার বিধায়ক নন্দিতা রিয়াং। ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দাদের ‘গো ব্যাক’ স্লোগান এবং আক্রমণের মুখে পড়ে একপর্যায়ে জীবন বাঁচাতে একটি ঘরের ভেতর আশ্রয় নিতে বাধ্য হন ওই বিধায়িকা।
এদিকে প্রদ্যোত কিশোর দেববর্মণের আচমকা সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণার পর এমনিতেই পাহাড়ে হাজারও জল্পনা ঘুরপাক খাচ্ছিল, তার ওপর মাঠ পর্যায়ের এই অব্যাহত সংঘর্ষ প্রমাণ করে দিয়েছে যে সাধারণ কর্মী সমর্থকেরা এই কৃত্রিম জোটকে মন থেকে মেনে নেননি।
তবে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চমক ও কৌতুকপ্রদ নাটকীয়তা দেখা গেছে উত্তর ত্রিপুরা জেলার ধর্মনগরের উত্তর ধনীছড়া ভিলেজ কাউন্সিল গঠনকে কেন্দ্র করে। সেখানে তিপ্রা মথা ও বিজেপির তথাকথিত জোটের সব নীতি-নৈতিকতা এক নিমেষে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। ৯টি আসন বিশিষ্ট ওই ভিলেজ কাউন্সিলে জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ৫টি আসন। কিন্তু ফলাফলে দেখা যায় বিজেপি ৪টি, সিপিআই(এম) ৩টি এবং তিপ্রা মথা ২টি আসনে জয়লাভ করেছে।
ফলে কোনো একক দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই বিজেপি-মথা বোর্ড গঠনের কথা ছিল। কিন্তু বিজেপির সঙ্গে প্রকাশ্যে সংঘাত ও নিচুতলার অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে তিপ্রা মথা সোজা হাত মেলায় তাদের চিরশত্রু সিপিআই(এম)-এর সঙ্গে। আসন সংখ্যার সমীকরণে মথা ও বামফ্রন্ট একত্রিত হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা (৫টি আসন) অর্জন করে ভিলেজ কাউন্সিল দখলের ছক কষে ফেলে।
দুই দলের এই যৌথ বিজয় মিছিলের কোলাহল আর উচ্ছ্বাস রাজ্যবাসীকে এক নতুন দৃশ্যপটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে যে সিপিআই(এম) তিপ্রা মথার রাজনীতি ও আদর্শকে তুলোধোনা করে এসেছে, এবং তিপ্রা মথা যাদের বিরুদ্ধে পাহাড়ে লড়াই করে উঠে এসেছে, আজ কেবল ক্ষমতা ও বোর্ড দখলের স্বার্থে সেই দুই শিবিরের এমন মাখামাখি বা “প্রেমের সম্পর্ক” রাজনৈতিক বিশ্লেষকদেরও স্তম্ভিত করেছে।
স্থানীয় স্তরের এই অদ্ভুত সমীকরণ প্রমাণ করে যে, রাজ্য স্তরে বিজেপি-মথার সম্পর্কটি কেবলই এক ‘লোক দেখানো ঝামেলা’ এবং এটি ‘উপরে দোস্তি, নিচে কুস্তি’র আদর্শ উদাহরণ। বিজেপির অন্দরে এই ঘটনাকে ঘিরে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। একদিকে নিজেদের কর্মীরা শরিকি সন্ত্রাসের শিকার হয়ে দল ছাড়ছেন, অন্যদিকে শরিক দলই বামপন্থীদের সাথে গোপনে গোপন আঁতাত গড়ে তুলে বিজেপিকে কোণঠাসা করছে। সব মিলিয়ে, তিপ্রা মথা-বিজেপি জোটের ভবিষ্যৎ আজ গভীর অন্ধকারে এবং উত্তর ধনীছড়া থেকে শান্তিরবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত এই রাজনৈতিক অস্থিরতা ত্রিপুরা রাজ্যের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।






