Manashree Crowd Funding : একদিকে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে এসএমএ টাইপ-১ আক্রান্ত ছোট্ট শিশু মনোশ্রী চৌধুরী। অন্যদিকে সেই শিশুর জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসার জন্য মানুষের সহানুভূতিতে সংগৃহীত কোটি কোটি টাকা ঘিরে তৈরি হয়েছে একের পর এক বিস্ফোরক প্রশ্ন। চিকিৎসার জন্য সংগৃহীত অর্থ কোথায় রয়েছে, কীভাবে খরচ হচ্ছে, কার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সেই অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা কেন—এই প্রশ্নগুলির মধ্যেই এবার সামনে এসেছে আরও গুরুতর ঘটনা।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে পশ্চিম থানায় মামলা হয়েছে রাজা সাহা-সহ তিনজনের বিরুদ্ধে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন রাজা সাহা, যিনি নিজেকে সমাজসেবক হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন এবং যাকে সদ্য বিজেপি দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগেই তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
এবার মনোশ্রীর চিকিৎসার অর্থ স্থানান্তরকে কেন্দ্র করে তাঁর নাম জড়িয়ে পড়ায় গোটা ঘটনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। ঘটনার সূত্রপাত গত ২৮ সেপ্টেম্বর। ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, মনোশ্রীর চিকিৎসার জন্য ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে তার বাবা ধ্রুব চৌধুরীর এইচডিএফসি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে প্রায় ২ কোটি ৭৬ লক্ষাধিক টাকা। বিপুল এই অর্থের একটি বড় অংশ অন্যত্র স্থানান্তরের উদ্যোগকে ঘিরেই শুরু হয় জটিলতা। জানা গেছে, ধ্রুব চৌধুরীর পক্ষ থেকে RTGS-এর মাধ্যমে এই অর্থ এইচডিএফসি ব্যাংকের দিল্লি শাখার মাধ্যমে ‘ইমপ্যাক্ট গুরু–কেয়ার গুরু’ নামে একটি অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরের আবেদন করা হয়েছিল। অর্থাৎ, যে টাকা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মনোশ্রীর চিকিৎসার জন্য সংগৃহীত হয়েছে, সেই বিপুল অর্থ অন্য একটি তহবিলে স্থানান্তরের প্রস্তাব সামনে আসে।
কেন এই স্থানান্তর? ব্যাংক সূত্রে দাবি, ব্যাংকে থাকা বিপুল অর্থ জালিয়াতির শিকার হতে পারে—এই আশঙ্কা থেকেই অর্থ অন্যত্র রাখার আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু ঠিক সেই সময়েই বিষয়টি নিয়ে উঠতে শুরু করে একাধিক প্রশ্ন। আগরতলার দুই মহিলা ক্রাউড ফান্ডিংয়ের অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার নিয়ে পশ্চিম ত্রিপুরা জেলা শাসকের কাছে আবেদন করেন বলে জানা গেছে। জেলা শাসকের কার্যালয় থেকেও গোটা বিষয়টি নিয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি আসে। ফলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষও সরাসরি অর্থ স্থানান্তরে সম্মতি দেয়নি বলে দাবি।
আর এখান থেকেই যেন ঘটনার আসল নাটকীয় মোড়। ২৮ সেপ্টেম্বর আচমকাই রাজা সাহা, অমিত কুমার সাহা এবং অমৃত দেব ব্যাংকে হাজির হন বলে অভিযোগ। উদ্দেশ্য—ব্যাংক ম্যানেজারের সঙ্গে অর্থ স্থানান্তরের বিষয় নিয়ে কথা বলা। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, তাঁদের মধ্যে একজন মোবাইল ফোনে ব্যাংকের ভিতরের কথোপকথন বা পরিস্থিতি রেকর্ড করার চেষ্টা করেন। ম্যানেজার তাতে আপত্তি জানালে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ। এরপর কথাকাটাকাটি বাড়তে বাড়তে ব্যাংক ম্যানেজারকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দাবি, অর্থ স্থানান্তরের বিষয়ে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আর চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে থাকেনি।
২৯ সেপ্টেম্বর ব্যাংকের পক্ষ থেকে আগরতলা পশ্চিম থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ মামলা গ্রহণ করে তদন্ত শুরু করেছে। এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—মনোশ্রীর চিকিৎসার জন্য মানুষের কাছ থেকে সংগৃহীত ২ কোটি ৭৬ লক্ষাধিক টাকা নিয়ে এত টানাপোড়েন কেন? এই অর্থ যদি শুধুমাত্র চিকিৎসার জন্যই সংগৃহীত হয়ে থাকে, তাহলে অন্য একটি সংস্থার তহবিলে তা স্থানান্তরের প্রয়োজনীয়তা কোথায়? অর্থ স্থানান্তরের প্রক্রিয়ায় পরিবারের সদস্যের পরিবর্তে অন্য ব্যক্তিদের উপস্থিতি ও ভূমিকা নিয়েই বা এত প্রশ্ন কেন? আরও বড় প্রশ্ন—মনোশ্রীর চিকিৎসায় প্রকৃতপক্ষে কত টাকা প্রয়োজন? ইতিমধ্যে কত টাকা খরচ হয়েছে? কোন হাসপাতাল, কোন চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং কোন জীবনরক্ষাকারী ওষুধের জন্য কত অর্থ বরাদ্দ বা ব্যয় হয়েছে? যে ওষুধকে ঘিরে মনোশ্রীর জীবন বাঁচানোর আশা দেখানো হচ্ছে, সেটি আদৌ বুকিং বা সংগ্রহ করা হয়েছে কি না—তার নথি কোথায়? ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের পূর্ণ হিসাব কি সাধারণ মানুষের সামনে প্রকাশ করা হয়েছে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখন অত্যন্ত জরুরি। কারণ এখানে বিষয়টি কোনও সাধারণ আর্থিক লেনদেনের নয়।
বিষয়টি একটি অসুস্থ শিশুর জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত। মানুষের আবেগ, সহানুভূতি এবং মানবিকতার ওপর ভর করে সংগৃহীত অর্থ নিয়ে যদি সামান্যতম অস্পষ্টতাও থাকে, তাহলে সেই অস্পষ্টতা দূর করার দায় সংশ্লিষ্ট সকলের। অন্যদিকে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের অভিযোগও কম গুরুতর নয়। একটি ব্যাংক ম্যানেজারের ওপর চাপ সৃষ্টি, হুমকি বা প্রভাব খাটানোর অভিযোগ সত্য হলে তা নিছক ব্যক্তিগত বাকবিতণ্ডা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ প্রশ্নটি তখন দাঁড়ায়—কার স্বার্থে এবং কোন উদ্দেশ্যে কোটি কোটি টাকার এই অর্থ স্থানান্তরের জন্য এত তৎপরতা? ঘটনার সঙ্গে জড়িত পক্ষগুলির বক্তব্য, ব্যাংকের নথি, RTGS আবেদন, জেলা প্রশাসনের চিঠি, ক্রাউড ফান্ডিংয়ের হিসাব এবং মনোশ্রীর চিকিৎসা সংক্রান্ত ব্যয়—সবকিছু সামনে এলে তবেই ছবিটি পরিষ্কার হবে। পুলিশ ইতিমধ্যে মামলা নিয়ে তদন্তে নেমেছে।
তদন্তে কোন তথ্য উঠে আসে, সেটিই এখন দেখার। ত্রিপুরাবাসীর একটাই প্রত্যাশা—মনোশ্রী সুস্থ হয়ে উঠুক। তার জীবন বাঁচাতে মানুষের যে সহানুভূতি ও অর্থ সহযোগিতা এসেছে, সেই অর্থ যেন শতভাগ তার চিকিৎসার কাজে লাগে। আর যদি সেই অর্থ নিয়ে কোনও অনিয়ম, অপব্যবহার কিংবা আর্থিক কারসাজির অভিযোগের সত্যতা থেকে থাকে, তাহলে তারও পর্দাফাঁস হওয়া জরুরি।কারণ একটি শিশুর জীবনকে সামনে রেখে সংগৃহীত মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ নিয়ে কোনও ধরনের প্রশ্নই যেন অন্ধকারে চাপা না পড়ে। মনোশ্রীর চিকিৎসা চলুক, চিকিৎসার অর্থের হিসাবও স্পষ্ট হোক—এটাই এখন মানুষের দাবি।






