Jolaibari Road News : বর্ষার মৌসুম চলছে। আর বরাবরের মতোই ত্রিপুরা রাজ্যের গ্রামীণ অবকাঠামোর কঙ্কালসার চিত্র পুনরায় উন্মোচিত হয়েছে। আর প্রত্যক্ষ উদাহরণ রয়েছে জোলাইবাড়িতে। এই বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত চরমপাই পাড়া এবং মধুলা সর্দার পাড়ায় যাতায়াতের প্রধান কাঁচা রাস্তাটি বর্তমানে পুরোপুরি চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই দীর্ঘদিনের অবহেলিত ও আনমেটালিজড রাস্তাটি এক বিশাল কাদা-পাঁকের জলাশয়ে পরিণত হয়েছে।
এর ফলে স্থানীয় সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে পথচারী—প্রত্যেককেই এক অভূতপূর্ব ও অসহনীয় দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। প্রতিদিনের এই নিত্যনৈমিত্তিক সংগ্রাম এখন গ্রামীণ জনজীবনের স্বাভাবিক গতিকে সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দিয়েছে। বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাস্তার বিভিন্ন অংশে জল জমে বিশাল আকারের গর্ত তৈরি হয়েছে, যা সাধারণ পথচারীদের জন্য ফাঁদে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজগামী ছাত্রছাত্রী, গর্ভবতী নারী, প্রবীণ নাগরিক এবং জরুরি চিকিৎসাপ্রার্থী রোগীদের জন্য এই পথ অতিক্রম করা যেন এক বিশাল ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান।
কোনো মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য জরুরি যানবাহন তো দূরের কথা, সাধারণ দু-চাকার গাড়ি কিংবা অটো-রিকশাও প্রবেশ করতে অস্বীকার করছে। ফলস্বরূপ, অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় রোগীকে ডুলিতে করে বা কাঁধে চাপিয়ে মূল সড়কে নিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন স্বজনেরা, যা স্বাধীন ভারতের আধুনিক উন্নয়ন ভাবনার মুখে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কথা তারা এক দিন বা দু দিনের জন্য নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে সংশ্লিষ্ট ব্লক প্রশাসন, পঞ্চায়েত প্রতিনিধি এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে লিখিত ও মৌখিক উভয়ভাবেই জানিয়েছেন।
নির্বাচন এলে প্রতিবারই স্থায়ী পাকা রাস্তা নির্মাণের ভুরি ভুরি প্রতিশ্রুতি মেলে, কিন্তু ভোট পার হতেই সেই সব প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির খাতা বন্দি হয়ে পড়ে থাকে। উন্নয়নের নানা স্লোগান ও সরকারি পরিসংখ্যানের মাঝে এই অঞ্চলের মানুষ যেন এক সম্পূর্ণ বিস্মৃত জনপদ হিসেবে অবস্থান করছে। ভৌগোলিক দূরত্ব এবং প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণে দীর্ঘকাল ধরে তাদের প্রাথমিক নাগরিক অধিকারটুকু থেকেও বঞ্চিত রাখা হচ্ছে। ধারাবাহিক বঞ্চনা এবং ক্ষোভের চরম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এবার তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে। ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীদের একটি বড় অংশ স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, আসন্ন দিনগুলোতে যদি এই কাঁচা রাস্তা দ্রুত সংস্কার করে পাকা করার সুনির্দিষ্ট ও স্থায়ী উদ্যোগ গ্রহণ না করা হয়, তবে তারা সর্বসম্মতভাবে আগামী নির্বাচন বয়কটের কঠোর পথ বেছে নেবেন।
‘রাস্তা নেই তো ভোট নেই’—এই নীতি অবলম্বন করে তারা নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ স্থগিত রাখার মাধ্যমে প্রশাসনের নীরবতা ও গাফিলতির বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতিবাদ গড়ে তুলতে চাইছেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনো অঞ্চলের নাগরিকদের সার্বিক ভোট বয়কটের সিদ্ধান্ত কেবল এক সাধারণ রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়, বরং এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতার এক চরম সামাজিক প্রতিক্রিয়া। গ্রামীণ অর্থনীতির অগ্রগতির ক্ষেত্রে যোগাযোগ ব্যবস্থা হলো মূল চালিকাশক্তি। কাদা এবং গর্তে ভরা এই রাস্তার কারণে স্থানীয় কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য যথাসময়ে নিকটবর্তী বাজারে নিয়ে যেতে পারছেন না, ফলে ব্যবসায়িক ও আর্থসামাজিক দিক থেকেও চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অর্থনীতির মৌলিক স্তম্ভগুলো যখন ভগ্ন যোগাযোগের কারণে ভেঙে পড়ে, তখন সামগ্রিক আঞ্চলিক উন্নয়ন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
জোলাইবাড়ি ব্লকের এই অবহেলিত জনপদের বাসিন্দারা আজ আর কোনো মৌখিক আশ্বাস বা সাময়িক সংস্কার চায় না; তাদের দাবি একটাই—অবিলম্বে টেকসই এবং স্থায়ী পাকা রাস্তা নির্মাণ করতে হবে। এখন দেখার বিষয়, স্থানীয় গণমাধ্যমে এই চরম জনদুর্ভোগের খবর ব্যাপকভাবে প্রচারিত হওয়ার পর জোলাইবাড়ি ব্লক প্রশাসন এবং ত্রিপুরা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর কতটা গুরুত্বের সঙ্গে এই মানবিক ও সামাজিক সমস্যাটিকে বিবেচনা করে। কেবল পরিদর্শন বা সাময়িক বালি-পাথর ফেলে তড়িঘড়ি কাদা ঢাকার কাজ নয়, বরং বাসিন্দাদের বহু প্রতীক্ষিত এই যাতায়াতের পথটিকে একটি স্থায়ী মেটাল বা পিচ রাস্তায় রূপান্তরিত করে তাঁদের দীর্ঘদিনের নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়া হবে কি না, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। স্থানীয় বাসিন্দারা এখন সরকারের পক্ষ থেকে বাস্তবমুখী পদক্ষেপের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।






