Agartala Crime News : যে মা পরম স্নেহে সন্তানকে কোলে-পিঠে করে মানুষ করেন, নিজের সর্বস্ব ত্যাগ করে তাকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখেন, সেই গর্ভধারিনী মা যখন নিজের সন্তানের হাতেই ক্রমাগত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন, তখন মানবতার ভিত্তি কেঁপে ওঠে। আগরতলার আমতলী থানার অন্তর্গত দক্ষিণ বাধারঘাট চারিপাড়া নব দিগন্ত ক্লাব সংলগ্ন এলাকায় সম্প্রতি যে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছে, তা কেবল এক প্রবীণ প্রমিলা মায়ের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের আধুনিক সামাজিক কাঠামোর চরম নৈতিক দেউলিয়াত্বকে উলঙ্গ করে দিয়েছে।
গত আট-দশ বছর আগে স্বামী খোকন সরকারকে হারানোর পর ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ বিধবা লক্ষ্মী রানী সরকার নিজের একমাত্র পুত্র সজল সরকারকে ঘিরে বেঁচে থাকার স্বপ্ন বুনেছিলেন। কিন্তু সেই আদরের সন্তানই আজ মায়ের জীবনের সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে সজল সরকার এবং তার স্ত্রী মৌসুমী দাস সরকার বৃদ্ধা মায়ের ওপর অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার চালিয়ে আসছে। গত মঙ্গলবার অত্যাচারের মাত্রা চরম রূপ নেয়, যখন লাঠি দিয়ে মারধর এবং চুল ধরে টানাটানির পর প্রবীণ মাকে নিজের স্বামীর তৈরি ভিটেবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। চরম অসহায় অবস্থায় নিজের প্রাণ বাঁচাতে মেয়েদের বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন এই বৃদ্ধা। এমনকি উনার বৃদ্ধ ভাতার টাকাও ছেলে-বউ ভোগ দখল করছে বলে জানা গেছে।
বুধবার নির্যাতিতা মা আমতলী থানায় ছেলে ও পুত্রবধূর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন এবং পুলিশ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আইনি প্রক্রিয়া কি এই ভঙ্গুর সমাজব্যবস্থার নৈতিক ক্ষত মেরামত করতে পারবে? যে নারী নিজের গর্ভজাত সন্তানের কাছেই সুরক্ষিত নন, তিনি অন্য কোথায় সুরক্ষা খুঁজবেন? সমাজ হিসেবে আমরা আজ কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে জন্মদাত্রী মাকে রক্ষা করার জন্য আইনি ব্যবস্থার দ্বারস্থ হতে হয়?
এই ঘটনায় কেবল পুলিশের কঠোর পদক্ষেপই শেষ কথা হতে পারে না। রাজ্য মহিলা কমিশন, যারা প্রতিনিয়ত নারী সুরক্ষা ও সচেতনতা নিয়ে সোচ্চার, তাদের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইনি বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি এই ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ নারীকে নিজের অধিকার ও ভিটেবাড়ি ফিরিয়ে দিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। সন্তান যদি মায়ের প্রতি দায়িত্বশীল ও শ্রদ্ধাশীল হতে না শেখে, তবে শিক্ষাগত বা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠা সম্পূর্ণ অর্থহীন। আমতলীর এই মর্মান্তিক ঘটনাটি সমগ্র সমাজের বিবেককে নাড়া দিয়ে গেল—আমরা যদি আজ প্রবীণদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হই, তবে আগামী প্রজন্ম আমাদের এই নির্মমতার জন্যই মনে রাখবে।






