Manik Sarkar : ত্রিপুরার রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও উত্তাপ ছড়াল শ্রমিক সংগঠনগুলির আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। অস্থায়ী শ্রমজীবীদের স্থায়ী নিয়োগ, বকেয়া ভাতা প্রদান-সহ একাধিক দাবিতে বিধানসভা অভিযানের ডাক দেয় বামপন্থী শ্রমিক সংগঠন CITU এবং TECC। এই কর্মসূচিকে ঘিরে রাজ্যের রাজধানীতে তৈরি হয় রাজনৈতিক উত্তেজনার আবহ।
মঙ্গলবার সকালে শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষ মিছিল করে রাজভবনের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। তবে চিরাচরিত ছবির পুনরাবৃত্তি ঘটে—মিছিল মাঝপথেই আটকে দেয় পুলিশ। এরপর অগন্নাথ দিঘির পাড়ে অনুষ্ঠিত হয় একটি বৃহৎ জনসমাবেশ, যেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার, বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরী, সিআইটিইউ-র সাধারণ সম্পাদক শংকর প্রসাদ দত্ত এবং শিক্ষক-কর্মচারী সংগঠনের নেত্রী মহুয়া রায়।
সমাবেশে মূলত চার দফা দাবিকে সামনে রাখা হয়। এর মধ্যে ছিল—অস্থায়ী শ্রমিকদের নিয়মিতকরণ, বকেয়া ডিএ/ডিআর প্রদান, শ্রম কোড কার্যকর না করা এবং ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের পুনর্নিয়োগ। সংগঠনের নেতৃত্বের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে এই দাবিগুলি উপেক্ষিত হচ্ছে, ফলে শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে শংকর প্রসাদ দত্ত বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের ন্যূনতম অধিকার রক্ষা করাও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে মহুয়া রায় অভিযোগ করেন, গণতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন করার অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে কর্মচারী ও শিক্ষক সমাজকে।
সমাবেশের মূল আকর্ষণ ছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে কেন্দ্র ও রাজ্যের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা। তিনি সরাসরি বলেন,
“স্বাধীনতার পর গত ৭৮ বছরে এতটা প্রতিক্রিয়াশীল ও জনবিরোধী সরকার দেশবাসী দেখেনি।”
তার মতে, বর্তমান সরকার মূলত শোষক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছে এবং সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ক্রমাগত খর্ব করছে। তিনি অভিযোগ করেন, মানুষের মৌলিক চাহিদা—কাজ, ন্যায্য মজুরি এবং সামাজিক নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়েছে সরকার।
মানিক সরকারের বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্প MGNREGA বা রেগা নিয়ে। তিনি দাবি করেন, বামপন্থীদের চাপের ফলেই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-এর আমলে এই প্রকল্প চালু হয়েছিল।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথমে সীমিত আকারে শুরু হলেও পরে সারা দেশের গ্রামীণ এলাকায় এই প্রকল্প কার্যকর করতে বাধ্য হয় কেন্দ্র। এই প্রকল্পের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ গ্রামীণ শ্রমিক ন্যূনতম আয়ের সুযোগ পেতেন।
কিন্তু বর্তমান বিজেপি সরকার পরিকল্পিতভাবে এই প্রকল্পকে দুর্বল করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর কথায়,
“রেগা কার্যত বাতিল করে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষের ন্যূনতম আয়ের নিশ্চয়তাও কেড়ে নেওয়া হয়েছে।”
সমাবেশে বক্তারা বারবার উল্লেখ করেন, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করেন এবং তাদের মধ্যে অধিকাংশই দৈনিক মজুরির উপর নির্ভরশীল। এই অবস্থায় কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে গেলে সরাসরি প্রভাব পড়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতে।
মানিক সরকারের মতে, রেগা প্রকল্প দুর্বল হয়ে পড়ায় গ্রামীণ দরিদ্রদের মধ্যে অনাহার ও অর্ধাহারের প্রবণতা বাড়ছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সামাজিক অস্থিরতাও বাড়তে পারে।
বিধানসভা অধিবেশন চলাকালীন এই অভিযান সংগঠিত হওয়ায় আন্দোলনকারীদের একটি বড় লক্ষ্য ছিল—তাদের দাবিগুলি যেন বিধানসভায় উত্থাপিত হয়। মানিক সরকার বলেন,
“বিধানসভায় থাকা সমস্ত রাজনৈতিক দলকে এই বিষয়ে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে।”
তার মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের দাবির প্রতিফলন হওয়া উচিত বিধানসভায়, এবং সেই কারণেই এই ধরনের আন্দোলন প্রয়োজনীয়।
মিছিল আটকে দেওয়ার ঘটনায় পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করতে গেলেও বারবার বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এর ফলে গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে বলে দাবি তাদের।
অন্যদিকে, বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে এই ধরনের তীব্র আক্রমণ আগামী দিনে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, এই বিধানসভা অভিযান ত্রিপুরার রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। শ্রমজীবী মানুষের দাবি-দাওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক সংঘাতও আরও প্রকট হয়ে উঠছে। এখন দেখার বিষয়, এই আন্দোলনের প্রভাব কতটা পড়ে সরকারের নীতিতে এবং বিধানসভার আলোচনায়।



