TSECL Ratan Lal Nath : ত্রিপুরা রাজ্য বিদ্যুৎ নিগম লিমিটেডের অধীনস্থ সুপার ইসিবিসি (Energy Conservation Building Code) বিল্ডিং নির্মাণের লক্ষ্যে বনমালীপুরে বুধবার ভূমিপূজন ও শিলান্যাস অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ত্রিপুরার বিদ্যুৎমন্ত্রী রতনলাল নাথ, সাংসদ রাজীব ভট্টাচার্য, আগরতলার মেয়র দীপক মজুমদার সহ অন্যান্য জনপ্রতিনিধি ও আধিকারিকরা।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিদ্যুৎমন্ত্রী রতনলাল নাথ বলেন, বর্তমান সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে গ্যাস ও কয়লার মতো খনিজ সম্পদের উপর নির্ভরশীলতা দীর্ঘস্থায়ী নয়। তিনি বলেন, গ্যাস একদিন শেষ হয়ে যাবে। কয়লা ও গ্যাস দুটোই খনিজ সম্পদ। বর্তমানে ওএনজিসি পর্যাপ্ত গ্যাস দিতে পারছে না। পালাটানা, রামচন্দ্রনগর ও রুখিয়াতেও গ্যাসের জোগান কমে যাচ্ছে।
বিদ্যুৎমন্ত্রী আরও বলেন, এই বাস্তবতা অনেক আগেই অনুধাবন করেছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। সেই কারণেই সৌরশক্তির মতো বিকল্প ও পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, যখন মানুষ নিজের বাড়িতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে, তখন আর ট্রান্সমিশন লস থাকবে না। বিদ্যুৎ পরিবহণের সময় যে ক্ষতি হয়, তার বোঝা সাধারণ মানুষের উপর পড়বে না।
ত্রিপুরার বিদ্যুৎ পরিকাঠামোয় গত সাত বছরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, আগে রাজ্যে ১৩২ কেভি সাবস্টেশন ছিল ১২টি, বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ২১টি এবং আরও দুটি নির্মাণাধীন। ১৩২ কেভি লাইনের দৈর্ঘ্য ৪৮৫ কিলোমিটার থেকে বেড়ে হয়েছে ৯৮৬ কিলোমিটার।
৩৩ কেভি সাবস্টেশন আগে ছিল ৪৪টি, এখন হয়েছে ৭৫টি এবং আরও ১৮টি নির্মাণাধীন। আন্ডারগ্রাউন্ড কেবল আগে ছিল মাত্র ৯৫ কিলোমিটার, বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ৪০৮ কিলোমিটার।
তিনি জানান, আগরতলা শহরের সম্পূর্ণ কর্পোরেশন এলাকাকে আন্ডারগ্রাউন্ড বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জানুয়ারি মাসে টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহের মধ্যে কাজ শুরু হবে। এর ফলে ঝড়, বৃষ্টি ও সাইক্লোনের সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাট অনেকটাই কমবে।
আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে রতনলাল নাথ বলেন, যারা সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে, তারাই টিকে থাকবে। কম্পিউটার, মোবাইল, ডিজিটাল লেনদেন, স্মার্ট মিটার, ক্যাশলেস ব্যবস্থা ও আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ না করলে পিছিয়ে পড়তে হবে।
বনমালীপুরে নির্মিত হতে চলা সুপার ইসিবিসি বিল্ডিংটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ কোটি ৩৩ লক্ষ টাকা। এটি জি প্লাস থ্রি, অর্থাৎ চারতলা বিশিষ্ট ভবন হবে এবং নির্মাণ সম্পূর্ণ করতে সময় লাগবে প্রায় ১৮ মাস।
এই ধরনের বিল্ডিং সারা দেশে মাত্র পাঁচটি নির্মিত হচ্ছে, যার মধ্যে ত্রিপুরা অন্যতম। এই ভবনের মাধ্যমে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব হবে। এই ভবনে স্টেট ডিজিগনেটেড এজেন্সি, ব্যুরো অফ এনার্জি এফিসিয়েন্সির অফিস এবং ত্রিপুরা রাজ্য বিদ্যুৎ নিগমের সার্কেল ওয়ান ও সার্কেল টু-র অফিস থাকবে।
বর্তমানে ত্রিপুরায় বিদ্যুতের পিক ডিমান্ড প্রায় ৩৭৮ মেগাওয়াট। আগামী ২০৩১-৩২ সালে এই চাহিদা বেড়ে প্রায় ৬৫০ মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। এই চাহিদা পূরণের জন্য সৌরশক্তিকে প্রধান বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেন বিদ্যুৎমন্ত্রী।
তিনি বলেন, যদি ৫ লক্ষ পরিবার মাত্র ২ কিলোওয়াট করে সৌর প্যানেল বসায়, তাহলে প্রতিদিন প্রায় ১০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এমনকি ২ লক্ষ পরিবার সৌর প্যানেল বসালেও প্রায় ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। এতে রাজ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে আত্মনির্ভর হয়ে উঠবে।
বিদ্যুৎমন্ত্রী জানান, বর্তমানে ত্রিপুরায় বিদ্যুৎ গ্রাহকের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১০ লক্ষ ৫৭ হাজার। আগের সরকারের সময় এই সংখ্যা ছিল ৭ লক্ষ ২১ হাজার। এটি রাজ্যের উন্নয়নের প্রতিফলন।
তিনি আরও বলেন, আগে রাজ্যের মাথাপিছু আয় ছিল বছরে ১ লক্ষ ৪০০ টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ১ লক্ষ ৯৮ হাজার টাকা। সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে মাথাপিছু আয় ৩ লক্ষ ৭০ হাজার টাকায় উন্নীত করা।
সুপার ইসিবিসি বিল্ডিং নির্মাণ ত্রিপুরার শক্তি সাশ্রয়ী ও প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বিদ্যুৎ পরিকাঠামোর উন্নয়ন, সৌরশক্তির প্রসার এবং আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে ত্রিপুরা যে নতুন দিশায় এগোচ্ছে, এই ভূমিপূজন অনুষ্ঠান তারই প্রতীক হয়ে থাকল।



