Shanti Kami Sangha Durga Puja : আগরতলার বনেদী ক্লাব শান্তি কামি সংঘ এ বছর তাদের ৭০তম দুর্গাপুজো উদযাপন করতে চলেছে এক বিশেষ আবহে। প্রতি বছরের মতোই তাদের প্যান্ডেল দর্শনার্থীদের জন্য অন্যতম আকর্ষণ হলেও, এবারের থিমে রয়েছে ভিন্ন মাত্রা। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত “ভোকাল ফর লোকাল” উদ্যোগকে সামনে রেখে, শান্তি কামি সংঘ স্থানীয় শিল্প ও কারুশিল্পকে উৎসাহ দিতে এই বছর সম্পূর্ণ দেশজ উপকরণে সাজাচ্ছে পুজোমণ্ডপ।
মণ্ডপের কাঠামো তৈরি হচ্ছে বাঁশ, বেত এবং কাঠের নিপুণ কাজে। রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী কারিগররা দিনরাত পরিশ্রম করে নিজেদের দক্ষতাকে তুলে ধরছেন এই শিল্পকর্মে। শুধুমাত্র পুজো নয়, এই থিমের মধ্য দিয়ে ক্লাব দেখাতে চাইছে কীভাবে স্থানীয় প্রতিভা ও সৃজনশীলতাকে গুরুত্ব দিলে সমাজ যেমন উপকৃত হয়, তেমনি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
ক্লাব সেক্রেটারি দীপক সিংহ জানিয়েছেন, এবারের বাজেট প্রায় ১২ লক্ষ টাকা, যার বড় অংশই ব্যয় হচ্ছে স্থানীয় শিল্পীদের কাজে। ফলে শিল্পীদের আর্থিকভাবে সহায়তা তো হচ্ছেই, পাশাপাশি দর্শনার্থীরাও রাজ্যের সংস্কৃতিকে কাছ থেকে উপভোগের সুযোগ পাবেন।
প্রতি বছরের মতো এবারও দূরদূরান্ত থেকে ভিড় জমবে বলে আশা করছে আয়োজকরা। শুধু পুজো নয়, সারা বছর সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা এই ক্লাব বিশ্বাস করে যে দুর্গাপুজোর মাধ্যমে সমাজে ঐক্য, শিল্প, আর স্বনির্ভরতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া যায়। এ বছর তাই শান্তি কামি সংঘের দুর্গোৎসব হয়ে উঠছে এক অনন্য উদাহরণ—যেখানে ভক্তি, ঐতিহ্য আর স্থানীয় কারুশিল্প মিলেছে এক সুতোয়।
ভোকাল ফর লোকাল এর ভাবনা হলো—স্থানীয় পণ্য, শিল্প ও কারুশিল্পকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যবহার করা এবং দেশীয় উৎপাদনকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা।
প্রত্যেক অঞ্চলের নিজস্ব ঐতিহ্য, হস্তশিল্প, লোকসংস্কৃতি আছে। এগুলো শুধু ঐতিহ্য নয়, মানুষের জীবিকা ও পরিচয়ের অংশ। ভোকাল ফর লোকাল উদ্যোগ মানুষকে স্থানীয় কারিগরদের কাজ কেনা ও প্রচার করতে উৎসাহ দেয়।
অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব – স্থানীয় পণ্যের চাহিদা বাড়লে গ্রামের ছোট ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে শহরের মাঝারি শিল্পোদ্যোগী—সবারই আয় বাড়ে। এতে কর্মসংস্থান তৈরি হয় এবং বাইরের পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমে।
সংস্কৃতি সংরক্ষণ – বিদেশি পণ্যের ভিড়ে অনেক সময় আমাদের নিজেদের শিল্প হারিয়ে যেতে বসে। যেমন বাঁশ-বেতের জিনিস, মাটির প্রতিমা বা হস্তশিল্পের গয়নাগাটি। ভোকাল ফর লোকাল এসব ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার এক কার্যকর উপায়।
আত্মনির্ভরতা গড়ে তোলা – এই আন্দোলনের মাধ্যমে বার্তা দেওয়া হয়, “আমরা নিজেরাই আমাদের শক্তি।” স্থানীয় পণ্য ব্যবহার করলে দেশ নিজের উৎপাদনশীলতায় এগিয়ে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে বিদেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমে।
গ্লোবাল দুনিয়ায় লোকাল ব্র্যান্ড – শুধু দেশেই নয়, ভোকাল ফর লোকাল-এর মাধ্যমে স্থানীয় জিনিস আন্তর্জাতিক বাজারেও পৌঁছাতে পারে। যেমন ভারতের হ্যান্ডলুম বা বাংলা টেরাকোটা শিল্প ইতিমধ্যেই বিদেশে সুনাম কুড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে, শান্তি কামি সংঘের এবারের দুর্গোৎসব শুধু আনন্দ আর উৎসবের আয়োজন নয়—এটি এক সামাজিক বার্তা বহন করছে। ভোকাল ফর লোকাল থিমের মাধ্যমে তারা দেখিয়ে দিলেন, আমাদের স্থানীয় শিল্প, কারুশিল্প ও প্রতিভাকেই যদি আমরা গুরুত্ব দিই, তবে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য যেমন টিকে থাকবে, তেমনি অর্থনৈতিক উন্নয়নেও নতুন দিশা মিলবে।
দেবী দুর্গার আগমনের সঙ্গে সঙ্গে এ বার্তা ছড়িয়ে পড়ুক সর্বত্র—আমাদের শক্তি আমাদের মাটিতে, আমাদের শিল্পে, আমাদের মানুষের মধ্যেই লুকিয়ে আছে।