Mungiakami Elephant News : তেলিয়ামুড়া মহকুমার মুঙ্গিয়াকামী থানাধীন রামকৃষ্ণপুর এডিসি ভিলেজের জুমবাড়ি এলাকায় এক মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ছড়িয়েছে। শুক্রবার গভীর রাতে বন্যদাতাল হাতির আক্রমণে নিজ বাড়িতেই প্রাণ হারান ৭০ বছর বয়সী মনিমালা দেববর্মা। রাত আনুমানিক ২টা নাগাদ ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় মুহূর্তের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে এলাকাজুড়ে, যা দ্রুতই রূপ নেয় ক্ষোভে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই এলাকায় হাতির উপদ্রব বেড়ে চলেছে। কিন্তু পর্যাপ্ত প্রতিরোধ বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় গ্রামবাসীরা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন। শুক্রবার রাতে সেই আশঙ্কাই সত্যি হয়ে দাঁড়ায়। বাড়ির ভিতরেই হাতির আক্রমণে মৃত্যু হয় বৃদ্ধার।
ঘটনার প্রতিবাদে শনিবার সকালে মৃতদেহ নিয়ে পরিবার-পরিজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা মুঙ্গিয়াকামী বাজার এলাকায় আসাম-আগরতলা জাতীয় সড়ক অবরোধ করে বসেন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই অবরোধে জাতীয় সড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণরূপে ব্যাহত হয় এবং উভয় দিকেই যানবাহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছান মহকুমা বন আধিকারিক ধীরেন কলোই। তবে তাঁর উপস্থিতিতেই উত্তেজনা আরও বাড়ে। স্থানীয়রা ক্ষোভ উগরে দিয়ে তাঁর উপর চড়াও হন বলে অভিযোগ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তিপ্রামথা নেতৃত্বরা হস্তক্ষেপ করে তাঁকে সেখান থেকে উদ্ধার করে নিজেদের কার্যালয়ে নিয়ে যান।
এদিকে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে কিছু উশৃঙ্খল যুবক স্থানীয় ফরেস্ট বিট অফিসে ভাঙচুর চালায় বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে যখন সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে দুই সাংবাদিক—হিরণ্ময় রায় ও নরেন চক্রবর্তী—আক্রমণের শিকার হন।
আক্রান্ত সাংবাদিক নরেন চক্রবর্তী জানান, “আমরা খবর পাই যে জুমবাড়ি এলাকায় হাতির আক্রমণে এক মহিলার মৃত্যু হয়েছে। সেই খবর সংগ্রহ করতে গিয়েছিলাম। পরে রাস্তা অবরোধ শুরু হলে আমরা সেটার ফুটেজ কভার করছিলাম। এরপর বনদপ্তরের অফিসে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে, সেটাও কভার করতে যাই। হঠাৎ কিছু উশৃঙ্খল যুবক আমাদের উপর চড়াও হয়।”
তিনি আরও বলেন, “তারা আমাদের ফুটেজ ডিলিট করতে বলে। আমরা বলি প্রয়োজন অনুযায়ী ফুটেজ রাখবো। কিন্তু তারা কথা না শুনে চারদিক থেকে আক্রমণ করে। আমার পায়ে, হাতে আঘাত লাগে, এমনকি মোবাইলেও আঘাত করা হয়। কোনোভাবেই আমাদের কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি।”
এই ঘটনায় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হওয়ার ঘটনায় বিভিন্ন মহলে নিন্দার ঝড় উঠেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে পৌঁছান মহকুমা পুলিশ আধিকারিক রোহান কৃষান। বিশাল পুলিশ ও টিএসআর বাহিনী মোতায়েন করা হয়। পরে ঘটনাস্থলে আসেন মহকুমা শাসক অপূর্ব কৃষ্ণ চক্রবর্তী, যিনি এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।
এদিকে, আসন্ন এডিসি নির্বাচনের প্রাক্কালে এই ঘটনায় রাজনৈতিক রং লাগতে শুরু করেছে। তিপ্রামথা মনোনীত প্রার্থী উৎপল দেববর্মা সহ দলের কর্মী-সমর্থকরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে মৃতের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। তবে এই উপস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তর্ক-বিতর্ক।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত জাতীয় সড়কে অবরোধ অব্যাহত রয়েছে এবং পরিস্থিতি থমথমে। প্রশাসন পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে তৎপর থাকলেও এলাকায় উত্তেজনা কাটেনি।
এই মর্মান্তিক ঘটনা শুধু একটি প্রাণহানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সীমান্তবর্তী এলাকায় মানব-প্রাণী সংঘাত, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতির দিকটিও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। পাশাপাশি, আসন্ন শ্বশাসিত জেলা পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ঘটনার প্রভাব কতটা পড়বে, এখন সেটাই রাজনৈতিক মহলের বড় প্রশ্ন।



