Dharmanagar BJP Clash : বিজেপির মারে ক্ষত বিক্ষত বিজেপি। বিবাদ থামাতে গিয়ে আবার সেই বিক্ষোভের মুখেই বিজেপি দলের এক বিধায়ক। বিধায়ক নিজেই বলছেন, “ আমাকে মার “ ।
যত দিন যাচ্ছে, ত্রিপুরায় বিজেপির গোষ্ঠী বিবাদ আরও যেন তীব্র থেকে তীব্র তর হচ্ছে। তুশের আগুনের মত জ্বলতে থাকা ক্ষোভ এখন প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। বিধায়ক গোষ্ঠী বনাম মণ্ডল সভাপতি গোষ্ঠীর লড়াই , হাতাহাতি ও মারধোর , অবশেষে হাসপাতালের বিছানায় বিজেপি দলের একাধিক কার্যকরতা। আর এই গোটা চিত্রের সাক্ষী রইলো বিজেপির জেলা কার্যালয় অটল ভবন।
গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, সিন্ডিকেট রাজ ও অর্থ কামাইয়ের আস্ফালনে ধর্মনগরে ধসে পড়ছে বিজেপি। কেন ধর্মনগরে আচমকা বিজেপি কর্মীদের মাঝেকার দ্বন্ধের বিস্ফরন ঘটলো , কেন পরিস্থিত সামাল দিতে গিয়ে নিজেই বিপাকে পরলেন বিধায়ক ?
এই ধর্মনগরেই গত কয়েক মাস পূর্বে উপ নির্বাচনে ব্যপক জনমতে পাশ করেছিলেন বিজেপির প্রার্থী জহর চক্রবর্তী। কিন্তু নিজ এলাকায় শান্তি কায়েম এবং দলীয় কর্মীদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধতা কায়েমে একেবারেই ব্যর্থ হয়েছেন বিজেপির পছন্দের এই জন প্রতিনিধি।
উন্নয়নের বুলি ও দলীয় শৃঙ্খলার ঢাকঢোল পিটিয়ে যে দলের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল, আজ সেই দলই খণ্ডযুদ্ধের আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়েছে। উত্তরের ধর্মনগরে ভারতীয় জনতা পার্টির অর্থাৎ বিজেপি দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন চরম আকার ধারণ করেছে। বুধবার ধর্মনগরের বিজেপি জেলা কার্যালয়ে দলেরই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও হাতাহাতি ঘটেছে, তা দলের বর্তমান করুণ ও জরাজীর্ণ অবস্থাকে জনসমক্ষে সম্পূর্ণ নগ্ন করে দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা কেবল সাময়িক কোনো ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং ক্ষমতার দখল, সিন্ডিকেট রাজ কায়েম এবং অর্থ কামাইয়ের অবাধ প্রতিযোগিতাই এই সার্বিক পরিস্থিতির ভয়াবহতার মূল কারণ।
দীর্ঘদিন ধরে ধর্মনগরে বিজেপির প্রধান নিয়ন্ত্রক ছিলেন প্রয়াত বিধায়ক বিশ্ববন্ধু সেন। তাঁর প্রয়াণের পর ধর্মনগর বিজেপি কার্যত অভিভাবকহীন ও নেতৃত্বহীন অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পর থেকে গোটা অঞ্চল জুড়ে বিজেপি দল এক ছন্নছাড়া ও দিশাহীন রূপ নিয়েছে। নতুন বিধায়ক জহর চক্রবর্তী দলের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ বা লাগাম ধরে রাখতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, বিধায়ক হিসেবে তিনি কেবল নামমাত্র আসনে বসে রয়েছেন, আর নেপথ্যে তাঁর স্ত্রী বর্ণালী গোস্বামীর প্রত্যক্ষ মদতেই ধর্মনগরে গোষ্ঠীকোন্দল প্রতিদিন ডালপালা মেলাচ্ছে।
ধর্মনগরে বিজেপি দল আজ বহু খণ্ডে বিভক্ত। একপক্ষে রয়েছে বিধায়ক জহর চক্রবর্তী ও তাঁর স্ত্রী বর্ণালী গোস্বামীর অনুগামীরা, অপরদিকে দাঁত কামড়ে পড়ে রয়েছে মণ্ডল সভাপতি শ্যামল নাথ ও তাঁর অনুগত একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী। এর সাথে যুক্ত হয়েছে যুব মোর্চার পৃথক একটি গোষ্ঠী। সব মিলিয়ে ধর্মনগর বিজেপির বর্তমান অবস্থা এক অরাজক ‘হ য ব র ল’ রূপ ধারণ করেছে। গোষ্ঠীবাদের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে বিধায়ক জহর চক্রবর্তী কার্যত হার মেনেছেন।
জেলা কার্যালয়ে ঘটা সাম্প্রতিক খণ্ডযুদ্ধের সময় এই লবিবাজির আসল চেহারা সামনে চলে আসে। ঘটনার দিন তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হলেও, নিমেষেই তা হাতাহাতিতে রূপ নেয়। জেলা কার্যালয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিধায়ক জহর চক্রবর্তী ও তাঁর স্ত্রী বর্ণালী গোস্বামী ছুটে গেলেও প্রতিপক্ষ দলের আক্রোশের মুখে পড়েন খোদ বিধায়ক নিজেই। মণ্ডল সভাপতি শ্যামল নাথ ও তাঁর অনুগামীদের হাতে বেধড়ক আক্রান্ত ও প্রহৃত হন বিধায়কের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত মুন্না পাল ও মিহির কান্তি দেব। জানা গেছে, এদিনের মারপিটে বিধায়ক ও তাঁর স্ত্রীর পক্ষের লোকেরাই বেশি মার খেয়েছেন।
প্রতিপক্ষের এই তাণ্ডব ও নিজ দলের কর্মীদের তাড়া খেয়ে এক পর্যায়ে চরম অসহায় ও অপমানিত বোধ করে বিধায়ক জহর চক্রবর্তীকে চিৎকার করে বলতে শোনা যায়, “আমাকে এবার মার!” একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির মুখ থেকে এহেন মন্তব্য গোটা ধর্মনগরের রাজনৈতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
তবে এই বিরোধের পেছনে কোনো আদর্শিক লড়াই নেই; আসল উদ্দেশ্য হলো এলাকার তোলাবাজি, সরকারি ঠিকাদারি এবং সিন্ডিকেট রাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। বিশ্ববন্ধু সেনের প্রয়াণের পর তৈরি হওয়া ক্ষমতার শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিটি গোষ্ঠীই এখন ধর্মনগরের অর্থ উপার্জনের পথগুলো নিজেদের দখলে নিতে চাইছে। কার দল ভারী হবে, কে কোন সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দেবে এবং কার পকেটে কত বেশি কাটমানির টাকা ঢুকবে—তা নিয়েই চলছে এই লড়াই।
সব মিলিয়ে, ধর্মনগর বিজেপির এই সার্বিক চিত্র কেবল দলের জন্য নয়, গোটা অঞ্চলের শান্তির জন্য এক চরম অশনি সংকেত। শৃঙ্খলাবদ্ধ দলের দাবিদারদের এই অনৈতিক আচরণ ও অর্থ কামাইয়ের অনিয়ন্ত্রিত লোভ আজ সাধারণ মানুষের সুরক্ষাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।






