Sonamura Mannan Choudhury : সোনামুড়ায় সমাজসেবার আড়ালে প্রতারণার অভিযোগে বড়সড় পদক্ষেপ নিল প্রশাসন। বৃহস্পতিবার দুপুরে সোনামুড়া মহকুমা প্রশাসন ও সোনামুড়া থানার পুলিশের যৌথ অভিযানে বন্ধ করে দেওয়া হয় “মানুষ মানুষের জন্য” নামের একটি তথাকথিত নেশামুক্তি কেন্দ্র। এই কেন্দ্রের কর্ণধার, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে পরিচিত মান্নান চৌধুরী বর্তমানে পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন।
পুলিশ ও প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, দুর্গাপুর এলাকার বাসিন্দা মান্নান চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে সমাজসেবক হিসেবে পরিচয় দিয়ে সোনামুড়ার ধলিয়াই এলাকায় একটি ভাড়া বাড়িতে নেশামুক্তি কেন্দ্র পরিচালনা করছিলেন। সামাজিক মাধ্যমে লাইভ ভিডিও করে নেশাসক্ত যুবকদের রাস্তাঘাট থেকে তুলে এনে “বিনা পয়সায় চিকিৎসা”র প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো। একইসঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে অর্থসাহায্যও সংগ্রহ করা হচ্ছিল।
তবে বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রশাসনিক পরিদর্শনের সময় রেজিস্ট্রেশন খাতায় ৩৬ থেকে ৩৭ জন নেশাসক্তের নাম পাওয়া যায়, যাদের প্রত্যেকের নামের পাশে অর্থ প্রদানের হিসাব লেখা ছিল। তদন্তে উঠে আসে, প্রাথমিকভাবে পরিবারের কাছ থেকে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা নেওয়া হতো এবং পরে ধাপে ধাপে আরও টাকা দাবি করা হচ্ছিল। পুরো টাকা পরিশোধ না করলে ‘চিকিৎসা সম্পূর্ণ হবে না’—এমন শর্তও আরোপ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।
গত ১৯ তারিখ এই কেন্দ্রের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। বিশালগড়ের ‘আত্মশুদ্ধি ফাউন্ডেশন’-এর দুই কর্মকর্তা স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে মান্নান চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রতারণা ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তোলেন। জানা যায়, প্রথমে এই কেন্দ্রকে বিশালগড়ের আত্মশুদ্ধি নেশামুক্তি কেন্দ্র হিসেবে প্রচার করা হলেও পরে উভয়ের মধ্যে আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে বিবাদ শুরু হয়।
পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেয় বুধবার রাতে। অভিযোগ, কেন্দ্রের ভেতরে এক নেশাসক্ত যুবককে ব্যাপক মারধর করা হয়। তার নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ হয় এবং ঘটনার পর কয়েকজন নেশাসক্তকে গোপনে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়। প্রশাসনের আগমনের খবর পেয়ে অনেক নেশাসক্ত ভোররাতে কেন্দ্র ছেড়ে পালিয়ে যায় বলেও স্থানীয় সূত্রে দাবি।
প্রশাসনিক আধিকারিকরা জানান, কেন্দ্রটিতে কোনও চিকিৎসক, মেডিকেল টিম বা ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধির ব্যবস্থা ছিল না। নেশাসক্তদের মেঝেতে শুইয়ে রাখা হতো, পর্যাপ্ত খাবার, জল, স্যানিটেশন বা ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার সুযোগ ছিল না। এমনকি কয়েকদিন ধরে সাবান বা জল না পেয়ে অমানবিক অবস্থায় দিন কাটাচ্ছিল তারা।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, উদ্ধার হওয়া নেশাসক্তদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী তাদের পরিবারে ফেরত পাঠানো হবে। পাশাপাশি মান্নান চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা রুজু করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পুরো ঘটনার গভীর তদন্ত চলছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছে প্রশাসন।
সোনামুড়ার এই ঘটনা সমাজসেবার নামে চলা ভুয়ো কার্যকলাপের ভয়াবহ বাস্তব চিত্র সামনে এনে দিয়েছে। নেশামুক্তির মতো সংবেদনশীল বিষয়ে মানুষের দুর্বলতাকে পুঁজি করে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা শুধু আইনত অপরাধ নয়, মানবিক দিক থেকেও চরম নিন্দনীয়। প্রশাসনের সময়োপযোগী হস্তক্ষেপে একদিকে যেমন বহু নেশাসক্তের জীবন রক্ষা পেয়েছে, তেমনই প্রকাশ্যে এসেছে তথাকথিত সমাজসেবার আড়ালে চলা প্রতারণার চক্র।
এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে নেশামুক্তি কেন্দ্রগুলির উপর কঠোর নজরদারি, সঠিক লাইসেন্স ও স্বচ্ছতার প্রয়োজনীয়তা আরও একবার স্পষ্ট হলো। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষেরও সচেতন থাকা জরুরি, যাতে সমাজসেবার মুখোশের আড়ালে কেউ আর মানবিকতার সঙ্গে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করতে না পারে।



